ব্রিটিশ শাসনের প্রতিষ্ঠা ও বিস্তার: সম্পূর্ণ বাংলা নোটস ও MCQ
ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রতিষ্ঠা একদিনে হয়নি। বাণিজ্যিক স্বার্থ, সামরিক বিজয়, ভারতীয় শাসকদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, কূটনীতি এবং বিভিন্ন সম্প্রসারণবাদী নীতির মাধ্যমে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ধীরে ধীরে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে শক্তিশালী রাজনৈতিক শাসকে পরিণত হয়।
এই অধ্যায়ে পলাশীর যুদ্ধ, বক্সারের যুদ্ধ, দেওয়ানি লাভ, দ্বৈত শাসন, অধীনতামূলক মিত্রতা, স্বত্ববিলোপ নীতি, মহীশূর ও মারাঠা যুদ্ধ এবং ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পটভূমি সহজ বাংলায় আলোচনা করা হয়েছে।
বিনামূল্যে রেজিস্ট্রেশন করুন → WhatsApp-এ Daily Updates ও Exam News পেতে যোগ দিন১. ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রতিষ্ঠা: পটভূমি
ইউরোপীয় বণিকদের কাছে ভারত দীর্ঘদিন ধরে মসলা, সুতি ও রেশমি বস্ত্র এবং অন্যান্য মূল্যবান পণ্যের জন্য আকর্ষণীয় ছিল। সমুদ্রপথে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে পর্তুগিজ, ডাচ, ইংরেজ ও ফরাসিরা ভারতে বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে। পরে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নেয়।
ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের রানি প্রথম এলিজাবেথ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে রাজকীয় সনদ দেন। কোম্পানির প্রথম উদ্দেশ্য ছিল পূর্বদেশের সঙ্গে বাণিজ্য করা। মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতা, আঞ্চলিক শক্তির উত্থান, বাণিজ্যিক সুবিধা অর্জনের চেষ্টা এবং ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ নিয়ে কোম্পানি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ক্ষমতা বিস্তার করে।
ব্রিটিশদের উত্থানের প্রধান কারণ
- মুঘল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের দুর্বলতা এবং আঞ্চলিক শক্তির উত্থান।
- ভারতীয় শাসকদের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতা।
- কোম্পানির তুলনামূলক সংগঠিত সামরিক বাহিনী, নৌক্ষমতা ও আর্থিক সম্পদ।
- বাণিজ্যিক সুবিধা অর্জন এবং রাজস্ব আদায়ের অধিকার দখলের প্রচেষ্টা।
- চুক্তি, কূটনীতি, যুদ্ধ এবং দেশীয় রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের সমন্বিত ব্যবহার।
২. ব্রিটিশ শাসন বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ সময়রেখা
সরকারি চাকরির পরীক্ষায় সাল, যুদ্ধ, চুক্তি, গভর্নর-জেনারেল এবং নীতির মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয় করে প্রশ্ন করা হয়। নিচের তালিকাটি দ্রুত রিভিশনের জন্য তৈরি।
| সাল | ঘটনা | ঐতিহাসিক গুরুত্ব |
|---|---|---|
| ১৬০০ | ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজকীয় সনদ | ইংরেজ কোম্পানির বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ভিত্তি। |
| ১৬১৫–১৬১৮ | স্যার টমাস রো-এর মুঘল দরবারে উপস্থিতি | জাহাঙ্গীরের দরবারে ইংরেজ বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রসার। |
| ১৭৫৭ | পলাশীর যুদ্ধ | বাংলায় কোম্পানির রাজনৈতিক আধিপত্য বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। |
| ১৭৬৪ | বক্সারের যুদ্ধ | কোম্পানির সামরিক কর্তৃত্ব আরও দৃঢ় হয়। |
| ১৭৬৫ | দেওয়ানি লাভ | বাংলা, বিহার ও ওড়িশায় রাজস্ব আদায়ের অধিকার লাভ। |
| ১৭৭৩ | Regulating Act | কোম্পানির প্রশাসনের ওপর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি। |
| ১৭৮৪ | Pitt’s India Act | ভারতীয় বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার। |
| ১৭৯৩ | চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত | বাংলার জমিদারি ও রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন। |
| ১৭৯৮ | অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির প্রসার | লর্ড ওয়েলেসলির সময় দেশীয় রাজ্যের ওপর ব্রিটিশ প্রভাব বৃদ্ধি। |
| ১৮০১ | অযোধ্যার নবাবের ভূখণ্ড হস্তান্তর | অধীনতামূলক মিত্রতা ব্যবস্থার আর্থিক চাপের উদাহরণ। |
| ১৮১৮ | তৃতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের সমাপ্তি | মারাঠা শক্তির রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসান ঘটে। |
| ১৮৪৮–১৮৫৬ | লর্ড ডালহৌসির শাসনকাল | স্বত্ববিলোপ নীতিসহ বিভিন্ন সংযুক্তিকরণ নীতির প্রসার। |
| ১৮৪৯ | পাঞ্জাব সংযুক্তি | দ্বিতীয় ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধের পরে পাঞ্জাব কোম্পানির অধীনে আসে। |
| ১৮৫৬ | অযোধ্যা সংযুক্তি | অপশাসনের অভিযোগকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়। |
| ১৮৫৭ | মহাবিদ্রোহ | কোম্পানি শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিদ্রোহ। |
| ১৮৫৮ | Government of India Act | কোম্পানি শাসনের অবসান এবং ক্রাউনের শাসন প্রতিষ্ঠা। |
৩. পলাশীর যুদ্ধ, ১৭৫৭
১৭৫৬ সালে আলিবর্দি খানের মৃত্যুর পরে সিরাজউদ্দৌলা বাংলার নবাব হন। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্গ মজবুত করা, অনুমতি ছাড়া রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা এবং নবাবের কর্তৃত্বে হস্তক্ষেপ নিয়ে সংঘাত বাড়ে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বাধীন কোম্পানি বাহিনীর কাছে পরাজিত হন।
পলাশীর যুদ্ধের প্রধান কারণ
- নবাবের অনুমতি ছাড়া কলকাতায় দুর্গের সুরক্ষা বৃদ্ধি নিয়ে বিরোধ।
- কোম্পানির বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার এবং শুল্কসংক্রান্ত বিরোধ।
- বাংলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোম্পানির হস্তক্ষেপ।
- সিরাজউদ্দৌলার বিরোধীদের সঙ্গে কোম্পানির গোপন যোগাযোগ ও ষড়যন্ত্র।
যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- তারিখ: ২৩ জুন ১৭৫৭।
- বাংলার নবাব: সিরাজউদ্দৌলা।
- কোম্পানি বাহিনীর নেতৃত্ব: রবার্ট ক্লাইভ।
- গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা: মীরজাফরের বাহিনী যুদ্ধে কার্যকরভাবে নবাবকে সহায়তা করেনি।
- পরিণাম: সিরাজউদ্দৌলার পতন এবং মীরজাফরের নবাব পদে প্রতিষ্ঠা।
পলাশীর যুদ্ধের গুরুত্ব
পলাশীর যুদ্ধের পরে বাংলার নবাবের ওপর কোম্পানির রাজনৈতিক প্রভাব দ্রুত বাড়ে। কোম্পানি বিপুল অর্থ ও বাণিজ্যিক সুবিধা লাভ করে। তবে এই যুদ্ধের পরেই কোম্পানি সমগ্র ভারত শাসন করতে শুরু করেনি; পরবর্তী যুদ্ধ, রাজস্ব অধিকার ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের মাধ্যমে তার ক্ষমতা আরও প্রসারিত হয়।
আরও বিস্তারিত পড়ুন: পলাশীর যুদ্ধ ও বক্সারের যুদ্ধ: কারণ, ঘটনা, ফলাফল ও MCQ।
৪. বক্সারের যুদ্ধ, ১৭৬৪
পলাশীর যুদ্ধের পরে মীরজাফর ও মীরকাশিমের সঙ্গে কোম্পানির সম্পর্কের অবনতি ঘটে। মীরকাশিম বাংলার প্রশাসন ও রাজস্ব ব্যবস্থায় নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান। কোম্পানির বাণিজ্যিক সুবিধা এবং দেশীয় বণিকদের ওপর আরোপিত শুল্কের বৈষম্য নিয়ে বিরোধ তীব্র হয়। শেষ পর্যন্ত ১৭৬৪ সালের ২২ অক্টোবর বক্সারের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
যুদ্ধে কারা অংশগ্রহণ করেন?
- মীরকাশিম — বাংলার প্রাক্তন নবাব।
- শুজাউদ্দৌলা — অযোধ্যার নবাব।
- শাহ আলম দ্বিতীয় — মুঘল সম্রাট।
- কোম্পানি বাহিনী — মেজর হেক্টর মনরোর নেতৃত্বে।
বক্সারের যুদ্ধের ফলাফল
- মীরকাশিম, শুজাউদ্দৌলা ও শাহ আলম দ্বিতীয়ের সম্মিলিত বাহিনী পরাজিত হয়।
- উত্তর ভারতের রাজনীতিতে কোম্পানির সামরিক মর্যাদা ও প্রভাব বৃদ্ধি পায়।
- ১৭৬৫ সালের এলাহাবাদের চুক্তি এবং পরবর্তী ব্যবস্থার মাধ্যমে কোম্পানি বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি অধিকার লাভ করে।
- কোম্পানি রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে নিজস্ব প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর ব্যয় মেটানোর শক্তিশালী ভিত্তি পায়।
৫. দেওয়ানি লাভ ও বাংলায় দ্বৈত শাসন
দেওয়ানি লাভ, ১৭৬৫
১৭৬৫ সালে মুঘল সম্রাট শাহ আলম দ্বিতীয়ের কাছ থেকে কোম্পানি বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি লাভ করে। দেওয়ানি বলতে মূলত রাজস্ব আদায়ের অধিকার বোঝায়। এর ফলে কোম্পানি ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে সংগৃহীত রাজস্ব ব্যবহার করে পণ্য কেনা, সেনাবাহিনী পরিচালনা এবং প্রশাসনিক ব্যয় মেটাতে পারে।
বাংলায় দ্বৈত শাসন, ১৭৬৫–১৭৭২
রবার্ট ক্লাইভের সময় বাংলায় যে দ্বৈত শাসনব্যবস্থা চালু হয়, তাতে কোম্পানির হাতে রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা থাকলেও নবাবের প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর নামমাত্র নির্ভরতা বজায় ছিল। ফলে রাজস্ব আদায় ও প্রশাসনিক দায়িত্বের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয়।
- দেওয়ানি: রাজস্ব আদায়ের অধিকার কোম্পানির হাতে।
- নিজামত: আইনশৃঙ্খলা ও ফৌজদারি প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নবাবের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
- সমস্যা: প্রকৃত ক্ষমতা ও প্রশাসনিক দায়িত্বের বিভাজনের কারণে জবাবদিহি দুর্বল হয়।
- অবসান: ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭২ সালে দ্বৈত শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটান।
রাজস্ব আদায়ের কঠোরতা, দুর্বল প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং ১৭৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের প্রভাব বাংলার সমাজ ও অর্থনীতিতে গভীর সংকট তৈরি করে। দুর্ভিক্ষের কারণ বহুমাত্রিক ছিল; একে শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।
৬. ব্রিটিশ শাসন বিস্তারে বিভিন্ন যুদ্ধের ভূমিকা
ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ
মহীশূরের হায়দার আলি ও টিপু সুলতান দক্ষিণ ভারতে ব্রিটিশ সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। চারটি ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের ধারাবাহিকতা দক্ষিণ ভারতে কোম্পানির কর্তৃত্ব বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
| যুদ্ধ | সময়কাল | গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল |
|---|---|---|
| প্রথম ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ | ১৭৬৭–১৭৬৯ | মাদ্রাজের চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান। |
| দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ | ১৭৮০–১৭৮৪ | ১৭৮৪ সালের ম্যাঙ্গালোরের চুক্তি। |
| তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ | ১৭৯০–১৭৯২ | শ্রীরঙ্গপত্তনমের চুক্তিতে টিপু সুলতান ভূখণ্ড ছাড়তে বাধ্য হন। |
| চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ | ১৭৯৯ | শ্রীরঙ্গপত্তনমে টিপু সুলতানের মৃত্যু এবং মহীশূরের ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন। |
ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ
মারাঠা শক্তির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং পেশোয়া ও বিভিন্ন মারাঠা প্রধানের মধ্যে বিরোধ কোম্পানির সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করে। তিনটি ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় ১৮১৮ সালে তৃতীয় যুদ্ধের সমাপ্তির পর মারাঠা রাজনৈতিক আধিপত্য ভেঙে পড়ে।
- প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ: ১৭৭৫–১৭৮২।
- দ্বিতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ: ১৮০৩–১৮০৫।
- তৃতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ: ১৮১৭–১৮১৮।
ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধ ও পাঞ্জাব সংযুক্তি
অ্যাংলো-শিখ যুদ্ধ দুটি পর্যায়ে সংঘটিত হয়: ১৮৪৫–১৮৪৬ এবং ১৮৪৮–১৮৪৯। দ্বিতীয় ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধের পরে ১৮৪৯ সালে পাঞ্জাব ব্রিটিশ কোম্পানির অধীনে সংযুক্ত হয়।
পরীক্ষার কৌশল: প্রতিটি যুদ্ধের ক্ষেত্রে সময়কাল, প্রধান পক্ষ, চুক্তি এবং ফলাফল আলাদা করে লিখে রাখুন। যুদ্ধের নামের সঙ্গে সাল মিলিয়ে নিয়মিত MCQ অনুশীলন করুন।
৭. অধীনতামূলক মিত্রতা ও স্বত্ববিলোপ নীতি
অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি (Subsidiary Alliance)
লর্ড ওয়েলেসলি তাঁর শাসনকালে দেশীয় রাজ্যগুলির ওপর ব্রিটিশ প্রভাব বাড়ানোর জন্য অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেন। এই ব্যবস্থায় রাজ্যগুলি বাহ্যিক নিরাপত্তার জন্য ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এই ব্যবস্থার সাধারণ শর্তগুলির মধ্যে ছিল:
- দেশীয় শাসককে রাজ্যে ব্রিটিশ সৈন্য রাখার অনুমতি দিতে হতো।
- সৈন্যবাহিনীর ব্যয় বহন করতে হতো; ব্যর্থ হলে ভূখণ্ড ছাড়তে হতে পারত।
- স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত হতো।
- ব্রিটিশ রেসিডেন্ট দেশীয় দরবারে অবস্থান করে কোম্পানির স্বার্থ দেখতেন।
- শাসক অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের কিছু ক্ষমতা ধরে রাখলেও স্বাধীনতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেত।
হায়দরাবাদ এই ব্যবস্থার প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। অযোধ্যার ক্ষেত্রেও ব্রিটিশ প্রভাব বৃদ্ধি এবং ভূখণ্ড হস্তান্তরের ঘটনা দেখা যায়।
স্বত্ববিলোপ নীতি (Doctrine of Lapse)
লর্ড ডালহৌসির শাসনকালে স্বত্ববিলোপ নীতির মাধ্যমে একাধিক দেশীয় রাজ্য কোম্পানির অধীনে সংযুক্ত করা হয়। সাধারণভাবে কোনো দেশীয় শাসক স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী ছাড়া মারা গেলে এবং দত্তক উত্তরাধিকারকে কোম্পানি স্বীকৃতি না দিলে রাজ্য সংযুক্ত করার যুক্তি হিসেবে এই নীতি ব্যবহার করা হতো।
এটি দেশীয় রাজ্যগুলির উত্তরাধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে এবং শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে।
| রাজ্য | সংযুক্তির সাল | পরীক্ষায় মনে রাখার বিষয় |
|---|---|---|
| সাতারা | ১৮৪৮ | স্বত্ববিলোপ নীতির প্রাথমিক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। |
| সম্বলপুর | ১৮৪৯–১৮৫০ সময়পর্ব | বিভিন্ন সূত্রে সিদ্ধান্ত ও কার্যকর সংযুক্তির সাল আলাদা করে দেওয়া হতে পারে। |
| ঝাঁসি | ১৮৫৪ | রানি লক্ষ্মীবাইয়ের সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। |
| নাগপুর | ১৮৫৩ | ডালহৌসির সম্প্রসারণনীতির উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। |
| অযোধ্যা | ১৮৫৬ | স্বত্ববিলোপ নীতি নয়; অপশাসনের অভিযোগ দেখিয়ে সংযুক্তি। |
৮. ব্রিটিশ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বিকাশ
Regulating Act, 1773
এই আইনের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসনের ওপর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায়। বাংলার গভর্নরকে গভর্নর-জেনারেল পদে উন্নীত করার ব্যবস্থা করা হয় এবং কলকাতায় সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়। ওয়ারেন হেস্টিংস ছিলেন বাংলার প্রথম গভর্নর-জেনারেল।
Pitt’s India Act, 1784
এই আইনের মাধ্যমে কোম্পানির বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও রাজনৈতিক শাসনের মধ্যে নিয়ন্ত্রণের কাঠামো আরও স্পষ্ট হয় এবং ভারতীয় প্রশাসনে ব্রিটিশ সরকারের তদারকি বাড়ে।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, ১৭৯৩
লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করেন। এর মাধ্যমে জমিদারদের কাছ থেকে সরকারের রাজস্বের পরিমাণ স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করা হয়। এই ব্যবস্থা ভূমিস্বত্ব, কৃষক-জমিদার সম্পর্ক এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ এবং ১৮৫৮ সালের আইন
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ছিল। বিদ্রোহ দমন করার পরে ১৮৫৮ সালের Government of India Act-এর মাধ্যমে কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারতের শাসনভার ব্রিটিশ ক্রাউনের হাতে যায়।
৯. ব্রিটিশ শাসনের বিস্তার ও ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সম্পর্ক
ব্রিটিশ শাসন বিস্তারের ফলে দেশীয় রাজ্যগুলির স্বাধীনতা কমে যায়, অনেক শাসক ক্ষমতা হারান এবং বিভিন্ন অঞ্চলে রাজস্ব ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটে। এর সঙ্গে সামরিক অসন্তোষ, অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক-ধর্মীয় উদ্বেগ এবং তাৎক্ষণিক সামরিক কারণ যুক্ত হয়ে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পটভূমি তৈরি করে।
বিদ্রোহের প্রধান কারণ
- রাজনৈতিক: দেশীয় রাজ্য সংযুক্তি এবং শাসকদের ক্ষমতা হ্রাস।
- অর্থনৈতিক: রাজস্বনীতি, কৃষকদের চাপ এবং দেশীয় শিল্পের ওপর ঔপনিবেশিক অর্থনীতির প্রভাব।
- সামরিক: ভারতীয় সিপাহিদের মধ্যে বৈষম্য ও অসন্তোষ।
- তাৎক্ষণিক কারণ: এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজে গরু ও শূকরের চর্বি ব্যবহারের গুজব এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের আশঙ্কা।
বিদ্রোহের পরে কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে। তবে ১৮৫৮ সালে ক্রাউনের শাসন প্রতিষ্ঠা মানে ভারতের স্বাধীনতা নয়; ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
ফ্রি রেজিস্ট্রেশন করে পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করুন →১০. অনলাইন MCQ টেস্ট: ব্রিটিশ শাসনের প্রতিষ্ঠা ও বিস্তার
প্রতিটি প্রশ্নে একটি সঠিক উত্তর নির্বাচন করুন। সব উত্তর দেওয়ার পরে ফলাফল দেখুন। প্রতিটি প্রশ্নের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাও দেওয়া হবে।
১১. দ্রুত রিভিশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
পলাশী ও বক্সারের যুদ্ধের মধ্যে পার্থক্য কী?
পলাশীর যুদ্ধ ১৭৫৭ সালে সিরাজউদ্দৌলা ও কোম্পানির বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত হয়। বক্সারের যুদ্ধ ১৭৬৪ সালে কোম্পানির বাহিনী এবং মীরকাশিম, শুজাউদ্দৌলা ও শাহ আলম দ্বিতীয়ের সম্মিলিত বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত হয়। বক্সারের যুদ্ধ কোম্পানির সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতাকে আরও সুদৃঢ় করে।
দেওয়ানি বলতে কী বোঝায়?
দেওয়ানি হলো রাজস্ব আদায়ের অধিকার। ১৭৬৫ সালে কোম্পানি বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি লাভ করে।
অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির উদ্দেশ্য কী ছিল?
দেশীয় রাজ্যগুলিকে ব্রিটিশ সামরিক সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল করে তাদের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক ক্ষমতা সীমিত করা ছিল এই নীতির গুরুত্বপূর্ণ ফল।
স্বত্ববিলোপ নীতি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এই নীতির মাধ্যমে ডালহৌসির শাসনকালে কয়েকটি দেশীয় রাজ্য সংযুক্ত করা হয়। এতে দেশীয় শাসকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ে এবং ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব তীব্র হয়।
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পরে কী পরিবর্তন ঘটে?
১৮৫৮ সালের আইনের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারতের শাসনভার ব্রিটিশ ক্রাউনের হাতে যায়।
১২. সম্পর্কিত ইতিহাসের নোটস ও পরীক্ষার প্রস্তুতি
বিষয়টি আরও ভালোভাবে বুঝতে নিচের সম্পর্কিত অধ্যায়গুলি পড়ুন। এগুলি আপনার ইতিহাস প্রস্তুতির জন্য ধারাবাহিক পাঠের পথ তৈরি করবে।
- ভারতের ইতিহাস: সম্পূর্ণ বাংলা নোটস ও MCQ
- ইতিহাস কী? ইতিহাসের উৎস ও অধ্যয়নের পদ্ধতি
- সিন্ধু সভ্যতা: বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- বৈদিক যুগ: সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি
- মহাজনপদ ও মগধের উত্থান
- বৌদ্ধধর্ম ও জৈনধর্ম: তুলনামূলক আলোচনা
- পলাশীর যুদ্ধ ও বক্সারের যুদ্ধ: বিস্তারিত নোটস ও MCQ
- MyTestSeries-এর ফ্রি রেজিস্ট্রেশন
- MyTestSeries: পরীক্ষা প্রস্তুতি ও শিক্ষামূলক রিসোর্স
- MyTestSeries বাংলা শিক্ষামূলক রিসোর্স
প্রকাশের পরে প্রতিটি লিঙ্কের HTTP status এবং গন্তব্য পেজ যাচাই করুন। কোনো পেজের permalink পরিবর্তিত হলে সঠিক URL দিয়ে প্রতিস্থাপন করুন।
১৩. নির্ভরযোগ্য বাহ্যিক শিক্ষামূলক রিসোর্স
- NCERT Textbooks — পাঠ্যবই ও ইতিহাসের মূল ধারণা যাচাই করার জন্য।
- SATHEE: British Expansion in India — পলাশী, বক্সার, অধীনতামূলক মিত্রতা ও স্বত্ববিলোপ নীতির রিভিশনের জন্য।
- UK Parliament — ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও আইন প্রণয়নের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুসন্ধানের জন্য।
এই বাহ্যিক লিঙ্কগুলিতে rel="nofollow" ব্যবহার করা হয়নি। লিঙ্কের বর্তমান কার্যকারিতা প্রকাশের সময় আবার যাচাই করুন।
১৪. সম্পর্কিত পরীক্ষা প্রস্তুতি ও অনুশীলন
প্রাচীন, মধ্যযুগীয় ও আধুনিক ভারতের ইতিহাস ধারাবাহিকভাবে পড়ুন।
ইতিহাস হাবে যান →গুরুত্বপূর্ণ সাল, যুদ্ধ, চুক্তি ও প্রশাসনিক নীতি নিয়ে নিজের প্রস্তুতি যাচাই করুন।
ফ্রি রেজিস্ট্রেশন করুন →১৫. FAQ: ব্রিটিশ শাসনের প্রতিষ্ঠা ও বিস্তার
ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রতিষ্ঠার সূচনা কোন যুদ্ধের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়?
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধকে বাংলায় কোম্পানির রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে ধরা হয়।
পলাশীর যুদ্ধ ও বক্সারের যুদ্ধের মধ্যে কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
দুটি যুদ্ধই গুরুত্বপূর্ণ। পলাশী কোম্পানির রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির মোড়, আর বক্সার সামরিক কর্তৃত্ব ও দেওয়ানি লাভের ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করে।
কোম্পানি কখন বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি লাভ করে?
১৭৬৫ সালে এলাহাবাদের চুক্তি-পরবর্তী ব্যবস্থার মাধ্যমে মুঘল সম্রাট শাহ আলম দ্বিতীয়ের কাছ থেকে কোম্পানি এই দেওয়ানি অধিকার লাভ করে।
অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি কে প্রয়োগ করেন?
লর্ড ওয়েলেসলি এই নীতিকে ব্রিটিশ সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেন।
স্বত্ববিলোপ নীতি কে প্রয়োগ করেন?
লর্ড ডালহৌসির শাসনকালে এই নীতি ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হয়।
অযোধ্যা কি স্বত্ববিলোপ নীতির মাধ্যমে সংযুক্ত হয়েছিল?
না। ১৮৫৬ সালে অপশাসনের অভিযোগ দেখিয়ে অযোধ্যা সংযুক্ত করা হয়েছিল।
বাংলায় দ্বৈত শাসনের অবসান কে ঘটান?
ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭২ সালে বাংলার দ্বৈত শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটান।
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পরে কী হয়?
১৮৫৮ সালের Government of India Act-এর মাধ্যমে কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারতের শাসনভার ব্রিটিশ ক্রাউনের হাতে যায়।
এই অধ্যায়ের জন্য কোন সালগুলি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?
বিশেষভাবে ১৭৫৭, ১৭৬৪, ১৭৬৫, ১৭৭৩, ১৭৮৪, ১৭৯৩, ১৮১৮, ১৮৪৯, ১৮৫৬, ১৮৫৭ ও ১৮৫৮ সালগুলি মনে রাখুন।
কোন সরকারি চাকরির পরীক্ষায় এই বিষয়টি কাজে লাগতে পারে?
আধুনিক ভারতের ইতিহাসের অংশ হিসেবে WBPSC, WBCS, SSC, রেলওয়ে, পুলিশ নিয়োগ, TET এবং বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিষয়টি প্রাসঙ্গিক হতে পারে। নির্দিষ্ট পরীক্ষার সিলেবাস যাচাই করুন।
শিক্ষামূলক নোট: পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য তথ্যগুলি নির্ভরযোগ্য পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে নিন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে কোনো কোনো ঘটনার তারিখ বা ব্যাখ্যায় সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে।




