ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও সমাজ সংস্কার | বিধবা বিবাহ আইন 1856, নারীশিক্ষা ও 10টি MCQ

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও সমাজ সংস্কার: জীবন, বিধবা বিবাহ আন্দোলন, নারীশিক্ষা ও অবদান

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন উনিশ শতকের বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক, লেখক ও মানবতাবাদী। নারীশিক্ষার প্রসার, বিধবা বিবাহের প্রচলন, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের বিরোধিতা এবং বাংলা গদ্য ও বর্ণমালার উন্নয়নে তাঁর অবদান ভারতীয় সমাজের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টার ফলে 1856 সালে Hindu Widows’ Remarriage Act বা হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন প্রণীত হয়। WBPSC, WBCS, WB Police, Clerkship, Primary TET, Upper Primary TET এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য এই অধ্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি আরও গোছানোভাবে শুরু করুন

বিনামূল্যে রেজিস্ট্রেশন করে My Test Series-এর স্টাডি আপডেট ও প্রস্তুতির সুযোগ গ্রহণ করুন।

Free Registration করুন
WhatsApp Daily Updates

1. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পরিচয় ও জন্ম

ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 1820 সালের 26 সেপ্টেম্বর বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মাতা ছিলেন ভগবতী দেবী। শৈশব থেকেই তিনি অত্যন্ত মেধাবী, অধ্যবসায়ী এবং জ্ঞানপিপাসু ছিলেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না হলেও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন।

তিনি কলকাতার সংস্কৃত কলেজে দীর্ঘদিন অধ্যয়ন করেন। সংস্কৃত ব্যাকরণ, সাহিত্য, বেদান্ত, দর্শন, অলংকার, স্মৃতি ও অন্যান্য শাস্ত্রে অসাধারণ দক্ষতা অর্জনের জন্য 1839 সালে তিনি ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি লাভ করেন। ‘বিদ্যাসাগর’ শব্দের অর্থ হলো বিদ্যার সাগর বা জ্ঞানের সমুদ্র।

এক নজরে বিদ্যাসাগর:

  • প্রকৃত নাম: ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
  • জন্ম: 26 সেপ্টেম্বর 1820
  • জন্মস্থান: বীরসিংহ গ্রাম, মেদিনীপুর, বাংলা
  • পিতা: ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
  • মাতা: ভগবতী দেবী
  • উপাধি: বিদ্যাসাগর
  • মৃত্যু: 29 জুলাই 1891
  • বিশেষ পরিচয়: শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক, বাংলা গদ্যসাহিত্যিক ও মানবতাবাদী

2. শিক্ষা ও কর্মজীবন

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনে শিক্ষা ছিল সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। তিনি মনে করতেন, সমাজের উন্নতির জন্য শিক্ষার সুযোগ সকলের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ বা আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে শিক্ষার অধিকার সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।

সংস্কৃত কলেজে শিক্ষা

তিনি কলকাতার সংস্কৃত কলেজে অধ্যয়ন করে সংস্কৃত ভাষা ও শাস্ত্রে অসাধারণ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। পরবর্তীকালে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ হন। 1851 সালে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি শিক্ষাব্যবস্থায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন।

শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার

  • সংস্কৃত কলেজে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ করেন এবং অ-ব্রাহ্মণ ছাত্রদের প্রবেশের পথ প্রশস্ত করেন।
  • শিক্ষার পাঠ্যক্রমে আধুনিক বিষয় ও ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নেন।
  • শিক্ষাদান পদ্ধতিকে আরও নিয়মতান্ত্রিক ও কার্যকর করার চেষ্টা করেন।
  • শিক্ষার্থীদের জন্য সহজবোধ্য পাঠ্যপুস্তক রচনায় গুরুত্ব দেন।
  • বাংলা ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার উপযোগী বই রচনা করেন।

তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞানচর্চা এবং আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় ঘটানো প্রয়োজন। তাঁর শিক্ষা সংস্কারের মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষাকে আরও যুক্তিনির্ভর, ব্যবহারিক ও সর্বজনীন করা।

3. নারীশিক্ষার প্রসারে বিদ্যাসাগরের অবদান

উনিশ শতকের বাংলায় নারীশিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। সমাজের একটি বড় অংশ মনে করত, মেয়েদের শিক্ষার প্রয়োজন নেই। বিদ্যাসাগর এই ধারণার বিরোধিতা করেন। তিনি মনে করতেন, নারীশিক্ষা ছাড়া কোনো সমাজের প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়।

নারীদের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি শুধু বক্তৃতা বা লেখালেখি করেননি, বাস্তব ক্ষেত্রেও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার উদ্যোগ নেন। জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুনের নারীশিক্ষা উদ্যোগকে তিনি সক্রিয়ভাবে সমর্থন করেন। 1849 সালে প্রতিষ্ঠিত বেথুন স্কুলের বিকাশে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর প্রধান কাজ

  • বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন।
  • অভিভাবকদের মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে উৎসাহিত করেন।
  • নারীশিক্ষার জন্য অর্থ সংগ্রহ ও সহায়তার ব্যবস্থা করেন।
  • নারীদের সামাজিক মর্যাদা ও আত্মনির্ভরতা বৃদ্ধির পক্ষে মত প্রকাশ করেন।
  • মেয়েদের শিক্ষাকে পরিবার ও সমাজের সামগ্রিক উন্নতির সঙ্গে যুক্ত করেন।

পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের জীবনীমূলক বিবরণে বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে বাংলায় 35টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নারীশিক্ষার প্রসারে তাঁর ভূমিকা তাঁকে উনিশ শতকের বাংলার অন্যতম প্রধান শিক্ষাসংস্কারকে পরিণত করেছে।

4. বিধবা বিবাহ আন্দোলন ও বিদ্যাসাগরের ভূমিকা

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কারমূলক কাজের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো হিন্দু বিধবাদের পুনর্বিবাহের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। তৎকালীন সমাজে বহু হিন্দু বিধবাকে অত্যন্ত কঠিন সামাজিক বিধিনিষেধের মধ্যে জীবন কাটাতে হতো। অল্প বয়সে স্বামী মারা গেলে অনেক নারীকে পুনর্বিবাহের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো।

বিদ্যাসাগর এই অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে যুক্তি, শাস্ত্রব্যাখ্যা এবং সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান। তিনি প্রাচীন হিন্দু ধর্মশাস্ত্র ও স্মৃতিশাস্ত্রের বিভিন্ন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখানোর চেষ্টা করেন যে বিধবা বিবাহের পক্ষে শাস্ত্রীয় যুক্তি রয়েছে।

বিধবা বিবাহ আন্দোলনের প্রধান পদক্ষেপ

  • 1855 সালে বিধবা বিবাহের পক্ষে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ও পুস্তিকা প্রকাশিত হয়।
  • তিনি শাস্ত্রীয় যুক্তি ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে বিধবা বিবাহের পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন।
  • বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়নের দাবিতে সরকারের কাছে আবেদন জানান।
  • বিধবা বিবাহের বিরোধীদের যুক্তির জবাব দেন।
  • আইন প্রণয়নের পর বাস্তবে বিধবা বিবাহের প্রচলনেও ভূমিকা রাখেন।

Hindu Widows’ Remarriage Act, 1856

বিদ্যাসাগরের নিরলস আন্দোলনের ফলে 1856 সালে ব্রিটিশ ভারতের সরকার Hindu Widows’ Remarriage Act, 1856 বা Act XV of 1856 প্রণয়ন করে। এই আইনের মাধ্যমে হিন্দু বিধবাদের পুনর্বিবাহ আইনগত স্বীকৃতি লাভ করে। বিধবা বিবাহের ফলে জন্মগ্রহণকারী সন্তানদের বৈধতার বিষয়টিও আইনে স্বীকৃত হয়।

পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

  • আইনের নাম: Hindu Widows’ Remarriage Act
  • প্রণয়নের বছর: 1856
  • আইনের নম্বর: Act XV of 1856
  • প্রধান সমাজসংস্কারক: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
  • মূল উদ্দেশ্য: হিন্দু বিধবাদের পুনর্বিবাহকে আইনগত স্বীকৃতি দেওয়া

মনে রাখতে হবে, আইনটি প্রণয়ন করেছিল তৎকালীন ঔপনিবেশিক সরকার। বিদ্যাসাগরের ভূমিকা ছিল এই আইন প্রণয়নের পক্ষে জনমত তৈরি, শাস্ত্রীয় যুক্তি উপস্থাপন এবং ধারাবাহিক সামাজিক আন্দোলন পরিচালনা করা। তাই আইনটি তাঁর একক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রণীত হয়েছিল—এমন বলা সঠিক নয়।



5. বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের বিরোধিতা

বিদ্যাসাগর মনে করতেন, বাল্যবিবাহ নারীর শারীরিক, মানসিক ও শিক্ষাগত বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। অল্প বয়সে বিবাহের ফলে বহু মেয়ের শিক্ষা বন্ধ হয়ে যেত এবং তারা অল্প বয়সেই সংসার ও সামাজিক দায়িত্বের চাপে পড়ত।

তিনি বাল্যবিবাহের বিরোধিতা করেন এবং সমাজে নারীর স্বাধীনতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত প্রকাশ করেন। একইভাবে তিনি বহুবিবাহের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানান। তাঁর মতে, নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ এবং একাধিক বিবাহের সামাজিক অনুমোদন সমাজে অন্যায় ও অসাম্যকে দীর্ঘস্থায়ী করে।

এই ক্ষেত্রে তাঁর চিন্তাধারা

  • নারীর মানবিক মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা।
  • বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সমাজকে সচেতন করা।
  • বহুবিবাহের বিরুদ্ধে যুক্তিনির্ভর প্রতিবাদ।
  • নারীদের শিক্ষিত ও আত্মনির্ভর করে তোলা।
  • সমাজে নারী-পুরুষের মর্যাদার বৈষম্য কমানোর চেষ্টা।

6. বাংলা ভাষা ও গদ্যসাহিত্যে অবদান

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শুধু সমাজসংস্কারক ছিলেন না, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশেও তাঁর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বাংলা গদ্যকে সহজ, সুসংবদ্ধ, প্রাঞ্জল ও শিক্ষার উপযোগী করে তুলতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর লেখার ভাষা ছিল স্পষ্ট, যুক্তিনির্ভর এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ।

বর্ণপরিচয়

1855 সালে প্রকাশিত বর্ণপরিচয় বাংলা ভাষা শিক্ষার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্যপুস্তক। শিশুদের বাংলা বর্ণমালা ও প্রাথমিক পাঠ শেখানোর জন্য বইটি বিশেষভাবে রচিত হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে বাংলা ভাষা শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে এই বইয়ের প্রভাব বজায় ছিল।

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনা

  • বর্ণপরিচয়: বাংলা বর্ণমালা ও প্রাথমিক ভাষাশিক্ষার বই।
  • বোধোদয়: শিশুদের জ্ঞান ও সাধারণ ধারণা গঠনের উপযোগী গ্রন্থ।
  • কথামালা: নীতিশিক্ষা ও পাঠাভ্যাস গঠনের জন্য রচিত।
  • শকুন্তলা: কালিদাসের সংস্কৃত নাটকের বাংলা রূপান্তর।
  • সীতার বনবাস: বাংলা গদ্যসাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য রচনা।
  • বেতাল পঞ্চবিংশতি: বাংলা গদ্য ও অনুবাদ সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।
  • উপক্রমণিকা: সংস্কৃত ব্যাকরণ শিক্ষার সহায়ক গ্রন্থ।

বাংলা গদ্যকে সাধারণ পাঠকের কাছে সহজবোধ্য করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ পরবর্তী সাহিত্যিকদের আলোচনায় আধুনিক বাংলা গদ্যের বিকাশে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা গুরুত্ব পেয়েছে।

7. অন্যান্য সমাজসেবামূলক কাজ

বিদ্যাসাগরের মানবতাবাদ শুধু নারীশিক্ষা বা বিধবা বিবাহ আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। দরিদ্র, অসহায় ও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দানশীলতা, সহানুভূতি ও মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন।

  • দরিদ্র শিক্ষার্থীদের আর্থিক সাহায্য করতেন।
  • শিক্ষা বিস্তারের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ নিতেন।
  • নারী ও শিশুদের উন্নয়নে কাজ করতেন।
  • সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়াতেন।
  • জাতিগত ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার প্রসারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেন।

জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি বর্তমান ঝাড়খণ্ডের কার্মাটাঁড় অঞ্চলে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন। সেখানেও তিনি স্থানীয় মানুষের শিক্ষা ও কল্যাণে কাজ করেন।

8. বিদ্যাসাগর ও বাংলার নবজাগরণ

উনিশ শতকের বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষা, যুক্তিবাদ, আধুনিক চিন্তা, সংবাদপত্র, সাহিত্য ও সমাজসংস্কারের যে বিস্তার ঘটে, তা সাধারণভাবে বাংলার নবজাগরণ নামে পরিচিত। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এই নবজাগরণের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব।

রাজা রামমোহন রায়ের মতো সমাজসংস্কারকদের উদ্যোগে যে আধুনিক চিন্তার ধারা শক্তিশালী হয়েছিল, বিদ্যাসাগর সেই ধারাকে নারীশিক্ষা, বিধবা বিবাহ ও সামাজিক মানবিকতার ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত করেন। তাঁর কাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল যুক্তি, মানবিকতা, শিক্ষা এবং বাস্তব সামাজিক পরিবর্তনের উপর গুরুত্ব দেওয়া।

বাংলার নবজাগরণে তাঁর অবদান

  • নারীশিক্ষার প্রসার ঘটানো।
  • বিধবা বিবাহের পক্ষে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।
  • বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের বিরোধিতা।
  • বাংলা গদ্য ও পাঠ্যপুস্তকের উন্নয়ন।
  • আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রসার।
  • মানবতাবাদ ও যুক্তিবাদী চিন্তার বিকাশ।

9. বিদ্যাসাগরের জীবন ও সমাজসংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ সময়রেখা

সাল ঘটনা
1820 26 সেপ্টেম্বর বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ।
1839 ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি লাভ।
1841 ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে সংস্কৃত বিভাগের প্রধান পণ্ডিত হিসেবে যোগদান।
1846 সংস্কৃত কলেজে সহকারী সচিব হিসেবে যোগদান।
1849 বেথুনের নারীশিক্ষা উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত থেকে সমর্থন প্রদান।
1851 সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন।
1855 বিধবা বিবাহের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ পুস্তিকা প্রকাশ; বর্ণপরিচয়ের প্রথম ভাগ প্রকাশ।
1856 Hindu Widows’ Remarriage Act প্রণীত হয়।
1891 29 জুলাই মৃত্যুবরণ করেন।

10. রাজা রামমোহন রায় ও বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কার: তুলনামূলক আলোচনা

রাজা রামমোহন রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উভয়েই উনিশ শতকের বাংলার সমাজসংস্কার আন্দোলনের প্রধান ব্যক্তিত্ব। তবে তাঁদের আন্দোলনের বিশেষ গুরুত্ব ও কাজের ক্ষেত্রের মধ্যে কিছু পার্থক্য ছিল।

বিষয় রাজা রামমোহন রায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
প্রধান পরিচয় ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারক শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক
প্রধান আন্দোলন সতীদাহ প্রথা বিলোপ বিধবা বিবাহ প্রচলন
প্রতিষ্ঠান ব্রাহ্মসভা/ব্রাহ্মসমাজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নারীশিক্ষা উদ্যোগ
গুরুত্বপূর্ণ আইন সতীদাহ নিষিদ্ধকরণ, 1829 Hindu Widows’ Remarriage Act, 1856
প্রধান লক্ষ্য ধর্মীয় কুসংস্কার ও সামাজিক অনাচার দূর করা নারীর অধিকার, শিক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা

এই দুই সমাজসংস্কারকের কাজ বাংলার আধুনিক সমাজচিন্তার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাঁদের সম্পর্কে আরও পড়ুন: রাজা রামমোহন রায় ও ব্রাহ্মসমাজ।

পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য আরও বাংলা নোটস ও স্টাডি আপডেট পেতে

My Test Series-এ বিনামূল্যে রেজিস্ট্রেশন করুন এবং আমাদের WhatsApp চ্যানেলে যুক্ত থাকুন।

এখনই Free Registration
Join WhatsApp Channel

11. পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একলাইনের তথ্য

  • ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্ম — 26 সেপ্টেম্বর 1820।
  • জন্মস্থান — বীরসিংহ, মেদিনীপুর।
  • পিতার নাম — ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
  • মাতার নাম — ভগবতী দেবী।
  • ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি লাভ — 1839 সালে।
  • তিনি ছিলেন — উনিশ শতকের বাংলার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক।
  • বিধবা বিবাহ আইন — Hindu Widows’ Remarriage Act, 1856।
  • বিধবা বিবাহ আইন — Act XV of 1856।
  • বর্ণপরিচয় প্রকাশ — 1855 সালে।
  • বেথুন স্কুল প্রতিষ্ঠার বছর — 1849।
  • সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হন — 1851 সালে।
  • মৃত্যু — 29 জুলাই 1891।
  • বিদ্যাসাগরের প্রধান আন্দোলন — বিধবা বিবাহ ও নারীশিক্ষার প্রসার।
  • তিনি বিরোধিতা করেন — বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের।

12. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও সমাজ সংস্কার: 10টি গুরুত্বপূর্ণ MCQ

WBPSC, WBCS, WB Police, Clerkship, TET এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নিচের প্রশ্নগুলি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

প্রশ্ন 1. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কত সালে জন্মগ্রহণ করেন?

(A) 1818

(B) 1820

(C) 1822

(D) 1825

সঠিক উত্তর: (B) 1820
ব্যাখ্যা: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর 26 সেপ্টেম্বর 1820 সালে মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

প্রশ্ন 2. ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি তিনি কোন সালে লাভ করেন?

(A) 1835

(B) 1837

(C) 1839

(D) 1841

সঠিক উত্তর: (C) 1839
ব্যাখ্যা: সংস্কৃত ভাষা ও শাস্ত্রে অসাধারণ পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি হিসেবে 1839 সালে তিনি ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি লাভ করেন।

প্রশ্ন 3. Hindu Widows’ Remarriage Act কত সালে প্রণীত হয়?

(A) 1829

(B) 1855

(C) 1856

(D) 1861

সঠিক উত্তর: (C) 1856
ব্যাখ্যা: বিদ্যাসাগরের আন্দোলনের ফলে 1856 সালে হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন প্রণীত হয়। এটি Act XV of 1856 নামে পরিচিত।

প্রশ্ন 4. বর্ণপরিচয় গ্রন্থের রচয়িতা কে?

(A) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

(B) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

(C) মদনমোহন তর্কালঙ্কার

(D) অক্ষয়কুমার দত্ত

সঠিক উত্তর: (B) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
ব্যাখ্যা: বাংলা ভাষার প্রাথমিক শিক্ষার জন্য বিদ্যাসাগর বর্ণপরিচয় রচনা করেন। এর প্রথম ভাগ 1855 সালে প্রকাশিত হয়।

প্রশ্ন 5. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মস্থান কোনটি?

(A) জোড়াসাঁকো

(B) কামারপুকুর

(C) বীরসিংহ

(D) রাধানগর

সঠিক উত্তর: (C) বীরসিংহ
ব্যাখ্যা: তিনি বর্তমান পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

প্রশ্ন 6. বিদ্যাসাগর কোন সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে বিশেষ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন?

(A) বিধবা বিবাহ

(B) বিধবা বিবাহের বিরোধিতা

(C) নারীশিক্ষা

(D) বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ

সঠিক উত্তর: (D) বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ
ব্যাখ্যা: বিদ্যাসাগর বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের বিরোধিতা করেন। তিনি বিধবা বিবাহের পক্ষে এবং নারীশিক্ষার প্রসারে কাজ করেন।

প্রশ্ন 7. বিদ্যাসাগর কোন কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন?

(A) প্রেসিডেন্সি কলেজ

(B) সংস্কৃত কলেজ

(C) ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ

(D) হিন্দু কলেজ

সঠিক উত্তর: (B) সংস্কৃত কলেজ
ব্যাখ্যা: 1851 সালে তিনি কলকাতার সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন এবং সেখানে শিক্ষাসংস্কারের উদ্যোগ নেন।

প্রশ্ন 8. বেথুন স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় কোন সালে?

(A) 1828

(B) 1835

(C) 1849

(D) 1856

সঠিক উত্তর: (C) 1849
ব্যাখ্যা: জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুনের উদ্যোগে 1849 সালে কলকাতায় হিন্দু ফিমেল স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীকালে বেথুন স্কুল নামে পরিচিত হয়। বিদ্যাসাগর এর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

প্রশ্ন 9. বিদ্যাসাগর কোন সালে মৃত্যুবরণ করেন?

(A) 1885

(B) 1889

(C) 1891

(D) 1895

সঠিক উত্তর: (C) 1891
ব্যাখ্যা: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর 29 জুলাই 1891 সালে মৃত্যুবরণ করেন।

প্রশ্ন 10. Hindu Widows’ Remarriage Act-এর আইনগত নম্বর কী?

(A) Act XVII of 1829

(B) Act XV of 1856

(C) Act III of 1872

(D) Act X of 1857

সঠিক উত্তর: (B) Act XV of 1856
ব্যাখ্যা: 1856 সালের Hindu Widows’ Remarriage Act ছিল Act XV of 1856। পরীক্ষায় আইনটির সাল ও নম্বর দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।

13. Frequently Asked Questions (FAQ)

প্রশ্ন 1. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কে ছিলেন?

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন উনিশ শতকের বাংলার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক, সমাজসংস্কারক ও মানবতাবাদী। নারীশিক্ষা, বিধবা বিবাহ এবং বাংলা গদ্যের বিকাশে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।

প্রশ্ন 2. বিদ্যাসাগর কত সালে জন্মগ্রহণ করেন?

তিনি 26 সেপ্টেম্বর 1820 সালে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

প্রশ্ন 3. বিধবা বিবাহ আইন কত সালে প্রণীত হয়?

Hindu Widows’ Remarriage Act 1856 সালে প্রণীত হয়। এটি Act XV of 1856 নামে পরিচিত।

প্রশ্ন 4. বিধবা বিবাহ আন্দোলনে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা কী ছিল?

তিনি শাস্ত্রীয় যুক্তি, লেখালেখি, আবেদন ও সামাজিক প্রচারের মাধ্যমে বিধবা বিবাহের পক্ষে জনমত তৈরি করেন। তাঁর ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলে 1856 সালের বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়নের পথ সুগম হয়।

প্রশ্ন 5. বর্ণপরিচয় কে রচনা করেন?

বর্ণপরিচয় রচনা করেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। বইটির প্রথম ভাগ 1855 সালে প্রকাশিত হয়।

প্রশ্ন 6. নারীশিক্ষার প্রসারে বিদ্যাসাগরের অবদান কী?

তিনি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় উদ্যোগ নেন, অভিভাবকদের মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে উৎসাহিত করেন এবং নারীশিক্ষার জন্য আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা সংগঠিত করেন।

প্রশ্ন 7. বিদ্যাসাগর কোন কোন সামাজিক প্রথার বিরোধিতা করেন?

তিনি বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের বিরোধিতা করেন। পাশাপাশি বিধবা বিবাহের পক্ষে এবং নারীর সামাজিক মর্যাদা ও শিক্ষার অধিকারের পক্ষে আন্দোলন করেন।

14. আরও পড়ুন: ইতিহাস ও সমাজসংস্কার বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ নোটস

প্রাচীন, মধ্যযুগীয় ও আধুনিক ভারতের ইতিহাস ভালোভাবে প্রস্তুত করতে নিচের সম্পর্কিত অধ্যায়গুলি পড়ুন। এগুলি My Test Series-এর ইতিহাস বিষয়ক স্টাডি রিসোর্সের সঙ্গে যুক্ত।

15. তথ্যসূত্র ও নির্ভরযোগ্য External Resources

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবন, শিক্ষা সংস্কার ও বিধবা বিবাহ আন্দোলন সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্যের জন্য নিচের সরকারি ও শিক্ষামূলক উৎসগুলি দেখতে পারেন।

16. Related Study Materials ও পরীক্ষার প্রস্তুতি

ইতিহাস, সাধারণ জ্ঞান এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য My Test Series-এর সংশ্লিষ্ট নোটস ও অনুশীলন সামগ্রী দেখুন।

প্রতিদিনের পরীক্ষা প্রস্তুতির আপডেট পেতে আমাদের সঙ্গে যুক্ত থাকুন

নতুন নোটস, গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও পরীক্ষার খবর পেতে WhatsApp চ্যানেলে Join করুন।

Free Registration
Join WhatsApp Channel

17. উপসংহার

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন এমন এক সমাজসংস্কারক, যিনি শিক্ষা, যুক্তি ও মানবিকতাকে সমাজ পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। বিধবা বিবাহ আন্দোলন, নারীশিক্ষার প্রসার, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের বিরোধিতা এবং বাংলা ভাষার উন্নয়নে তাঁর অবদান তাঁকে আধুনিক ভারতের ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।

প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য তাঁর জন্ম-মৃত্যুর সাল, ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি, বর্ণপরিচয়, সংস্কৃত কলেজে সংস্কার এবং 1856 সালের বিধবা বিবাহ আইন বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার।



Ranjan Malakar

About Ranjan Malakar

Ranjan Malakar is an experienced educational content writer and exam preparation mentor with more than 15 years of expertise in creating high-quality study materials, mock tests, MCQs, and competitive exam resources in Bengali, Assamese, and English languages.

He specializes in educational content related to WB Police, Panchayat, TET, Assam Exams, and various state-level competitive examinations. Through My Test Series, he continuously works to make exam preparation more accessible, affordable, and effective for students across India.

Visit Website


Get Daily Free Questions

Practice Faster. Score Higher.

Download Our App

Practice Faster. Score Higher. Install the App Now.

Categories

Test Series